দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ঘোষণায় স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন দেশটিতে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্টরা। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তারা। তাদের আশা, নতুন প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক কম খরচে ও সহজে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে এবং বাড়বে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ।
দুই বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগে এবার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। নিয়োগদাতা ও নিয়োগের অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদিত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্য থেকে পছন্দমতো এজেন্সি বেছে নিতে পারবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মাত্র ৬ হাজার টাকা ফি দিয়ে যেকোনো অনুমোদিত এজেন্সি মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ পাবে।
সরকারের অনুমোদনক্রমে ৩১২টি এজেন্সি এ প্রক্রিয়ায় ব্যবসা করার সুযোগ পাবে। অন্য এজেন্সিগুলোকেও পর্যায়ক্রমে এর আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি অনুমোদিত ২৫ এজেন্সির যেকোনোটির মাধ্যমে কাজের অনুমোদন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের অধীনে বিএমইটির ছাড়পত্র নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এতে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি সক্ষম ও বৈধ এজেন্সিগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে।
মালয়েশিয়াগামী শ্রমিকদের অনেকে বলছেন, দেশটিতে মজুরি তুলনামূলক ভালো এবং কাজের পরিবেশও অনুকূল। ফলে নতুন করে কলিং ভিসা চালুর খবরে তাদের মধ্যে আনন্দ ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, কম খরচে মালয়েশিয়ায় যেতে পারলে পরিবারের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নোয়াখালীর চাটখিলের বাসিন্দা মহিউদ্দিন রিংকু বলেন, ‘আমার খালাতো ভাই ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় গেছেন। তিনি ভালো প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে চাকরি করছেন। আমিও অনেক দিন ধরে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছি। অপেক্ষায় ছিলাম, মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা কখন খুলবে। আলহামদুলিল্লাহ, কলিং ভিসা চালুর ঘোষণা এসেছে। আশা করছি, এবার অল্প খরচে যেতে পারব।’
একই প্রত্যাশা পাবনার চাটমোহরের পারভেস আলমের। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালে চেষ্টা করেও যেতে পারিনি। এরপর অপেক্ষায় ছিলাম কখন মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা চালু হবে। এখন চালু হয়েছে। এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ।’
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গেছেন। তবে ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জন্য দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন ১ জুন থেকে নতুন করে বিদেশি কর্মী প্রবেশের সুযোগও বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া।
দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস)। গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) প্রকাশিত তালিকাটি বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। তবে কবে থেকে এবং কী প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি মালয়েশিয়া সরকার।
এদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেই একটি চক্র নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে বাজারটি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে।
রাজধানীর নয়াপল্টনের ম্যানপাওয়ার ব্যবসায়ী নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘সৌদি আরবের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোর একটি মালয়েশিয়া। বিশ্বের অনেক দেশে ভাষাজ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়া শ্রমিক নেওয়া হয় না। এদিক থেকে মালয়েশিয়া ব্যতিক্রম। তারা দক্ষ ও অদক্ষ—দুই ধরনের শ্রমিকই নেয়। ভাষা জানার প্রয়োজনও হয় না। সেখানে ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত। এর সঙ্গে ওভারটাইমের সুবিধাও রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার অনেক মিল রয়েছে। ফলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য দেশটি খুবই ভালো গন্তব্য। দুই বছরের বেশি সময় বাজারটি বন্ধ ছিল। এখন প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার উদ্যোগে বাজারটি খোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন শ্রমিকরা স্বল্প খরচে নিরাপদ কর্মসংস্থান পাবে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।’
নাজিম উদ্দিন আরও বলেন, ‘এবার প্রায় সব এজেন্সি মালিকের ব্যবসা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে শ্রমবাজারটি সবার জন্য আরও উন্মুক্ত ও বিস্তৃত হয়েছে।’
কাকরাইলের ব্যবসায়ী শফি উদ্দিন বলেন, ‘ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক শ্রমিক ফিরে আসছেন। এমন সময়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়া খুবই খুশির সংবাদ। আমরা আশা করছি, শ্রমিকরা স্বল্প খরচে নিরাপদে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘নিজে কাজ আনা এবং নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে বিএমইটির ছাড়পত্র নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও স্বস্তি এসেছে।’
শফি উদ্দিনের অভিযোগ, ‘যখনই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই একটি চক্র এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তারা কাউন্টার সেটিংসহ বিভিন্ন অবৈধ পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠায়। বৈধভাবে শ্রমিক গেলে তাদের অবৈধ কারবার বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণেই তারা বৈধভাবে শ্রমিক নেওয়ার বিরোধিতা করছে। সরকারের উচিত এই অসাধু চক্রকে কঠোরভাবে দমন করা।’
এফডব্লিউসিএমএসের প্রকাশিত তালিকায় থাকা ২৫টি এজেন্সি হলো—বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ লিমিটেড, বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট, জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি, মেসার্স ইউনাইটেড গালফ সার্ভিসেস, অ্যানেসা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আত-তাকওয়া ওভারসিজ লিমিটেড, আর্থ-স্মার্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, খান জাহান আলী ওভারসিজ, মেসার্স আল-শোতুপ ওভারসিজ, মাদারল্যান্ড ওভারসিজ লিমিটেড, রিফা ইন্টারন্যাশনাল, ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল, আল-হায়াত ওভারসিজ, ভালুকা ওভারসিজ, ব্রাদার্স ট্রেডিং অ্যান্ড কন্ট্রাক্টিং লিমিটেড, চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল, কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি, গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেড, জুয়েল রিঙ্কু এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার লিঙ্ক, নেবারস অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড, তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এবং অ্যাঙ্কর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন। একই সঙ্গে এফডব্লিউসিএমএস ৪০টি অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকাও প্রকাশ করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। তবে সে সময় বাজারটি চালু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া যান তারেক রহমান। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দেশটির শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়। সফরের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়।
পরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন মালয়েশিয়া সফরে গেলে বিষয়টি আরও এগিয়ে যায়।
দীর্ঘদিন পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘বায়রার সদস্যভুক্ত সব এজেন্সি যেন কাজ পায়, সরকারের পক্ষ থেকে সেই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, সব এজেন্সিই কাজ করার সুযোগ পাবে। আমরা চেষ্টা করছি স্বল্প খরচে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে। আশা করি, শ্রমিকরা কম খরচে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন।’

অনলাইন ডেস্ক 





















