জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা স্থায়ী আবাসিক মর্যাদা পাওয়ার নিয়ম আরও কঠোর করছে দেশটির সরকার। নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীদের গৃহস্থালি আয়, ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধা ও জাপানি ভাষাজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এতে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী বিদেশিদের একটি অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় আট বছর আগে কাজের জন্য জাপানে যাওয়া আবদুল নামে এক বাংলাদেশি নাগরিকও তাদের মধ্যে রয়েছেন। উত্তর টোকিওতে বাংলাদেশি স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করা এই প্রযুক্তি প্রকৌশলী স্থায়ী বসবাসের পাশাপাশি জাপানের নাগরিকত্বের জন্যও আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে নতুন নিয়মের কারণে দুই আবেদনই প্রত্যাখ্যাত হলে জাপান ছাড়ার বিকল্পও তাকে ভাবতে হচ্ছে।
নিজের প্রকৃত নাম প্রকাশ না করার শর্তে আবদুল আল জাজিরাকে বলেন, ভবিষ্যতে জাপান সরকার নিয়ম আরও কঠোর করবে কি না, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। দুই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে কী করবেন, সে প্রস্তুতিও নিতে হচ্ছে তাকে। এরই মধ্যে তিনি জাপানের বাইরে কাজের সুযোগ খুঁজতে শুরু করেছেন।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের বার্ষিক গৃহস্থালি আয় জাপানি পরিবারের গড় আয়ের চেয়ে বেশি হতে হবে। এ শর্তটি এপ্রিল থেকে জমা দেওয়া কিছু আবেদনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলে আল জাজিরা জানিয়েছে। পাশাপাশি আবেদনকারীর জাপানি ভাষায় দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধার বিষয়ও বিবেচনা করা হবে।
পেনশনের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ডে আবেদনকারীর ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধা এমন পর্যায়ে থাকতে হবে, যা নির্দিষ্ট আয়স্তরে কর্মচারীদের পেনশন ব্যবস্থায় ৩০ বছর অবদান রাখলে পাওয়া যেতে পারে। তবে আগের খসড়া নির্দেশনায় পেনশন সুবিধা নির্ধারিত মানের নিচে থাকলে সঞ্চয় বা অন্যান্য আর্থিক সম্পদের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছিল।
জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নতুন নীতির মূল যুক্তি হলো, স্থায়ী বাসিন্দাদের নিজেদের জীবনযাপন স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার সক্ষমতা থাকতে হবে এবং তারা যেন ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ওপর আর্থিক বোঝা হয়ে না দাঁড়ান। জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক নথিতে বিদেশিদের বসবাস ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোরতা আনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
নতুন নিয়ম নিয়ে উদ্বিগ্নদের মধ্যে রয়েছেন ১৪ বছর ধরে জাপানে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিক সারাহ নেলকিনও। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জাপানে আসা নেলকিন দেশটির বিনোদন শিল্পে কাজ করছেন। নতুন নিয়ম ঘোষণার কিছু আগে তিনি স্থায়ী বসবাসের আবেদন করেছিলেন। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে জাপানের নাগরিকত্ব নেওয়ার কথা ভাবছেন তিনি। তবে জাপান সাধারণভাবে দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃতি না দেওয়ায় সে ক্ষেত্রে তাকে মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়তে হতে পারে।
নেলকিনের ভাষ্য, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের পুরো সময়টাই তিনি জাপানে কাটিয়েছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরিবারের কাছে যাতায়াতসহ বিভিন্ন কারণে মার্কিন নাগরিকত্ব ধরে রাখতে চান তিনি। তারপরও বর্তমান পরিস্থিতিতে নাগরিকত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি তাকে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
জাপানের মেইকাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রিসা হাগিওয়ারা মনে করেন, নতুন পরিবর্তনগুলো দেশটির অভিবাসন নীতিকে আরও বাছাইভিত্তিক ও শর্তনির্ভর করে তুলছে। তার মতে, জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং শ্রমিক সংকটের কারণে জাপানের বিদেশি কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশটিতে বসবাসের সুযোগ কঠিন হয়ে গেলে বিদেশি কর্মীদের কাছে জাপান কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে দেশটিতে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৩৯৫ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি এবং প্রথমবারের মতো ৪০ লাখ ছাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, জাপানের নিজস্ব জনসংখ্যা কমছে। দেশটির দীর্ঘদিনের কম জন্মহারের মধ্যে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে বিদেশিদের নিয়ে নীতিতে একদিকে শ্রমবাজারের প্রয়োজন, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি বসবাস ও সামাজিক সংহতি নিয়ে উদ্বেগ, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চাপ তৈরি হয়েছে।
বিদেশিদের নিয়ে জাপানি সমাজের মনোভাবেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের একটি প্যানেল জরিপে ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা জাপানে আরও বিদেশি বাসিন্দা গ্রহণের বিরোধী। ২০২৪ সালের একই জরিপে এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মানুষের উত্তর নিয়ে পরিচালিত ওই গবেষণায় তরুণদের মধ্যে বিরোধিতার বৃদ্ধিও তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
এ পরিবর্তন জাপানের রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং জাপান ইনোভেশন পার্টি বর্তমানে ক্ষমতাসীন জোটে রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নিম্নকক্ষ নির্বাচনে এলডিপি ৩১৫টি আসন এবং জাপান ইনোভেশন পার্টি ৩৬টি আসন পায়। একই নির্বাচনে অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত সানসেইতো দল ১৫টি আসন পেয়ে নিম্নকক্ষে তাদের উপস্থিতি বাড়ায়।
তবে জাপানের অর্থনীতির জন্য বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট। জনসংখ্যা কমে যাওয়া ও শ্রমিক সংকটের মধ্যে দেশটি বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশিদের শুধু কতজন প্রয়োজন তা নয়, তারা দীর্ঘমেয়াদে জাপানে বসবাস করলে কেমন সমাজ তৈরি হবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
নতুন নিয়মের প্রভাব তাই শুধু স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। জাপানে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা বিদেশিদের কাছেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক যারা দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বসবাস করছেন, তাদের জন্যও নতুন শর্তগুলো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। সূত্র: আল জাজিরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক 






















