ইতালির স্কুলগুলোতে বোরকা ও নিকাব পরা নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। একই সঙ্গে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা আইন করে সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের স্কুলে একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা থাকলে তাদের অভিভাবকদের ইতালীয় ভাষা শেখানোও বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
রোববার রোমে নিজের দল ব্রাদার্স অব ইতালির যুব শাখার এক অনুষ্ঠানে মেলোনি এসব পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব শিগগিরই মন্ত্রিসভায় তোলা হবে। তবে এগুলো এখনো কার্যকর আইন নয়। সরকারের অনুমোদনের পর প্রস্তাবগুলোকে আইনে পরিণত করতে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
মেলোনির ঘোষণায় বোরকা ও নিকাবের পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলাদা বিধানের কথা বলা হয়েছে। তবে প্রতি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ সংখ্যা কত হবে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে জানাননি। ইতালির শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ইতোমধ্যে সীমিত রাখার একটি নীতি রয়েছে। ২০১০ সালের একটি নির্দেশনায় সাধারণভাবে কোনো স্কুল বা শ্রেণিতে বিদেশি শিক্ষার্থীর অনুপাত ৩০ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছিল। তবে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী এ নিয়মে ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে এবং বাস্তবে সব জায়গায় এটি একইভাবে কার্যকর হয়নি।
ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটির স্কুলগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১১ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর ইতালীয় নাগরিকত্ব নেই। ফলে মেলোনির নতুন প্রস্তাবের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ সীমার কী পরিবর্তন আনা হবে, সেটিই এখন আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মেলোনি বলেন, ইতালিতে যারা ভবিষ্যৎ গড়তে চান, তাদের ইতালীয় ভাষা শেখা, দেশটির সংস্কৃতি বোঝা এবং আইন মেনে চলা প্রয়োজন। স্কুলে একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যায় থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ইতালীয় ভাষা শেখানোর বাধ্যবাধকতার প্রস্তাবও এই পরিকল্পনার অংশ।
বোরকা ও নিকাবের বিষয়ে ইতালিতে বর্তমানে সরাসরি দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা নেই। ১৯৭৫ সালের একটি আইনে এমন পোশাক বা হেলমেট ব্যবহারে বিধিনিষেধ রয়েছে, যার কারণে যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া একজন ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ২০০৮ সালে ইতালির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত স্পষ্ট করেছিল, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কারণে পুরো মুখ ঢেকে রাখা পোশাক পরা যেতে পারে। পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে অবশ্য মুখ দেখাতে হবে।
মেলোনির নতুন পরিকল্পনার আগে দেশটির ক্ষমতাসীন জোটের শরিক লিগ পার্টিও মুখ ঢেকে রাখা পোশাকের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধের জন্য একটি বিল এনেছে। চলতি বছরের মার্চে সিনেটে জমা দেওয়া ওই প্রস্তাবে খেলাধুলা বা উপাসনালয়ের মতো নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ছাড়া মুখ ঢেকে রাখা পোশাক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে মেলোনির ঘোষণার সঙ্গে ইতালির রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও যোগ রয়েছে। আগামী বছর দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। অভিবাসন ও অভিবাসীদের একীভূতকরণ ইতালির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। মেলোনির দল ব্রাদার্স অব ইতালির ডানদিকে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া নতুন রাজনৈতিক শক্তি ‘ফুতুরো নাজিওনালে’ও সাম্প্রতিক সময়ে বোরকা নিষিদ্ধের দাবি তুলেছে।
মেলোনির প্রস্তাব নিয়ে ইতালিতে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি কিছু সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সীমিত করার বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও সমান অধিকারের প্রশ্ন উঠতে পারে। ইতালির সংবিধানের ৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদে স্কুল সবার জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা বলা হয়েছে।
ইউরোপের কয়েকটি দেশে ইতোমধ্যে জনসমক্ষে পুরো মুখ ঢেকে রাখা পোশাকের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। তবে দেশভেদে এসব আইনের আওতা ও প্রয়োগের নিয়ম ভিন্ন।
মেলোনির ঘোষিত পরিকল্পনার পর এখন মূল প্রশ্ন হলো, প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা ও বিদেশি শিক্ষার্থী সীমিত করার নিয়ম ঠিক কীভাবে আইনে রূপ পাবে। বিশেষ করে বর্তমান ৩০ শতাংশ সীমার পরিবর্তে নতুন কোনো নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভা ও পরে সংসদে গেলে এর বিস্তারিত বিধান প্রকাশ পাওয়ার কথা। সূত্র: রয়টার্স, আনসা, আল জাজিরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক 






















